৬ ডিসেম্বর, শুক্রবার, ৩ টায়, ফার্মগেট, ঢাকায়

বার কাউন্সিল প্রস্তুতি বিষয়ক
উন্মুক্ত সেমিনার!

আসন বুকিং দিন : 01712-908561

দেওয়ানি কার্যবিধি [ধারা ১-৩২, আদেশ ১-৯]


[বিশেষ জ্ঞাতব্য : এই কনটেন্টটি মূলত ‘আইনের ধারাপাত’ নামক বইটির 132-139 পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া হয়েছে।  আইনের ধারাপাত বইটি কুরিয়ারে সংগ্রহ করতে ফোন দিন : 01712-908561]

[এই অংশের ওপর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে আগামী 15 ডিসেম্বর। প্রস্তুতি নিতে থাকুন। জানেন নিশ্চয়ই যে, জ্যুসি ল তে এখন ফ্রি একাউন্ট খুলেও সীমিত সুবিধা নিয়ে মডেল টেস্টে অংশ নেওয়া যাচ্ছে। যারা ফ্রি একাউন্ট খুলেছেন তারা  কীভাবে পরীক্ষা দিতে হবে বা একাউন্ট ব্যবহার করতে হবে – তা যদি বুঝতে না পারেন তবে এই ভিডিওটি দেখে রাখতে পারেন : https://youtu.be/NeFQgtxJbZs]


আমাদের পড়ার সুবিধার্থে এবার দেওয়ানি কার্যবিধিকেও কয়েক ভাগে ভাগ করে নেবো। যদিও এই ভাগাভাগি অত্যন্ত কঠিন বিষয় দেওয়ানি কার্যবিধির গঠনগত কারণেই। দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ১-৩২ এবং আদেশ ১ থেকে ৯ পর্যন্ত একটি অংশ হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারি আমরা। এটিকে দেওয়ানি কার্যবিধির প্রথম অংশ ধরে নিয়ে পড়তে পারেন যেখানে কার্যবিধির বেসিক, আদালতের এখতিয়ার, মোকদ্দমার পক্ষসমূহ, তাদের প্রতিনিধিবৃন্দ, আরজি দাখিলের নিয়ম, সমন, আরজি, জবাব, প্লিডিংস ইত্যাদির পদ্ধতি, মোকদ্দমার পক্ষগণের উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ফলাফল ইত্যাদি বেসিক ধারণাসমূহ এবং সেগুলোর পদ্ধতিগত দিকগুলো বর্ণনা করা আছে। এই অংশ থেকে অনেক প্রশ্ন আসে বিধায় খুব গুরুত্ব সহকারে এটি দেখতে হবে। আবার সাধারণ জ্ঞান আকারে এটি জানা দরকার যেকোনো আইনের শিক্ষার্থীর। সুতরাং, একটু যত্ন করে পড়ে নিলে আপনারই লাভ। পরীক্ষাতেও অন্তত এই কার্যবিধির অংশ থেকে আনুমানিক ৭/৮ টি প্রশ্নের উত্তর করা সহজ হয়ে যাবে।

যত্ন করে পড়তে নির্দেশনা দিলাম যেহেতু, তাই নিচে আলোচ্য অংশটুকুর সূচি আবারো ছক আকারে দিলাম। মাথায় এর বিষয়বস্তুগুলো প্রথমে প্রধান শিরোনামের অংশ ধরে এবং পরে ভেতরে বর্ণিত বিষয়বস্তুসমূহ কী কী তা মনে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।


মূল ‘চিরুনি অভিযান’ এর পাঠকরা খানিকটা বিরক্ত হলেও অন্য সকলের জন্য প্লিডিংস, আরজি ও জবাব বিষয়ে বইয়ে সারসংক্ষেপিত আলোচনাটি এখানে তুলে দেওয়া হলো। বিশেষত যারা ধারা বা আদেশের সারমর্ম পড়ে পড়ে অভ্যস্ত তাদের এই আলোচনাটি কাজে দেবে আশা করি। প্রথমেই প্লিডিংস নিয়ে আদেশ ৬ সম্পর্কে সারসংক্ষেপ।

“… তার মানে, এই প্লি­ডিংস এ কোনো সাক্ষ্য বর্ণিত হবে না [বিধি ২]। প্রসঙ্গক্রমে কোনো দলিলের কথা আসলে সেটা সম্পর্কে অংশ বা সমগ্র ধরে কোনো বিবরণ দেওয়া যাবে না, বরং দলিলটির কি প্রভাব সেটা প্লি­ডিংস এ বলতে হবে [বিধি ৯]। যেকোনো প্লি­ডিংস সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং আইনজীবী কর্তৃক স্বাক্ষরিত হতে হবে [বিধি ১৪]। প্লি­ডিংস এ মোকদ্দমার সংশ্লিষ্ট পক্ষ সত্যপাঠ দেবেন যে, উপরোক্ত বর্ণিত দফাগুলোতে বিবরণীসমূহ সঠিক ও তার সজ্ঞানে সেটা লিখিত হয়েছে, সত্যপাঠে তার স্বাক্ষর থাকতে হবে তারিখসহ [বিধি ১৫]। এই বিধিতেই স্বাক্ষর করার স্থানের উল্লেখেরও বিধান রয়েছে। যারা কোর্টে নিয়মিত যান, তারা সম্ভবত বাস্তবে এটা দেখতে পান না। কেননা, ধরে নেওয়া হয় যে আইনজীবীর স্বাক্ষর উক্ত প্লি­ডিংস এ আছে, তাঁর চেম্বার বা টেবিলেই এই স্বাক্ষর করা হয়েছে, ফলে এটা আলাদাভাবে উল্লে­খ করার প্রয়োজন হয় না। বিধি ১৬ তে প্লি­ডিংস কর্তন, ১৭ তে প্লি­ডিংস সংশোধন এবং ১৮ তে সংশোধনের ব্যর্থতার পরিণতি সম্পর্কে বলা আছে। ১৬ থেকে ১৮ বিধি তিনটি বিস্তারিত আলোচনার আছে।

বিধি ১৬ অনুযায়ী প্লি­ডিংস এর কোনো অংশ কর্তন করা যাবে। বাদী বা বিবাদী প্রাথমিকভাবে মোকদ্দমা দায়েরের সময় অথবা জবাব দেওয়ার সময় উত্তেজিত হয়ে বা তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধতা থেকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বা কুৎসাজনক কিছু বলে ফেলতে পারে প্লি­ডিংস এ। এমনতর কিছু বলে ফেললে সেগুলো প্লি­ডিংস থেকে কর্তন বা বাদ দেয়ার আদেশ দিতে পারেন আদালত। এটি সংশোধন করার আদেশ আকারেও আদালত দিতে পারে। ১৬ বিধি অনুযায়ী কোনো কিছু অপ্রয়োজনীয় [Unnecessary], কুৎসাজনক [scandalous] ও মোকদ্দমার সুষ্ঠু বিচার বাধাগ্রস্থ করতে পারে [tend to prejudice, embarrass or delay the fair trial of the suit]- এই তিনটি বিষয়ের ক্ষেত্রে এই কর্তন করার আদেশ আদালত দিতে পারে এই তিনটি ক্ষেত্রের কথা মনে রাখবেন বিধিটির নম্বরসহ।

আরজি দায়ের করার পর যখন মোকদ্দমা শুরু হয়ে যায়, তখন এমন অবস্থার উদ্ভব হতেই পারে যে, আরজিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লে­খ করা বাদ পড়ে গেছে। সেরকম অবস্থায় আরজি বা জবাব অর্থাৎ প্লি­ডিংস এর সংশোধন করা যায় ৬ আদেশের ১৭ বিধি মোতাবেক। এখানে বলা হয়েছে যে, মোকদ্দমার যেকোনো পর্যায়েই প্লি­ডিংস সংশোধন করা যায়। আদালত এই অনুমতি দিয়ে থাকেন তবে তা ‘বিরোধের প্রকৃত প্রশ্ন নির্ধারণের উদ্দেশ্যেই এরূপ যাবতীয় সংশোধন করা যাবে’। এমনকি বিচারকার্য শুরু হবার পরেও যদি আদালত অভিমত পোষণ করে যে, যথেষ্ট চেষ্টা করা সত্ত্বেও বা পর্যাপ্ত সতর্ক হবার পরেও বিচারকাজ শুরু হবার আগে পক্ষগণ বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারতো না, তবে এরূপ ক্ষেত্রেও সংশোধনের অনুমতি দিতে পারে। এটি আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা। আদালতে অনেক সময় মোকদ্দমার পক্ষগণ বিচারকাজের দীর্ঘসূত্রিতা করার জন্য বা বিলম্ব করার জন্য এইসব সংশোধনী আনার চেষ্টা করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে আদালত যদি মনে করে বা আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, এইসব সংশোধন-টংশোধন কিছু না, সবই বিচারকাজকে বিলম্বিত করার চেষ্টা মাত্র, সেক্ষেত্রে আদালত উল্টো সংশোধন করার আবেদনকারীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশও দিতে পারেন। বেশ উত্তেজনাময় বিষয় কিন্তু!

সংশোধনের অনুমতি পাবার পর সংশোধন করতে ব্যর্থ হলে কি পরিণতি হবে সে সম্পর্কে ৬ আদেশের শেষ বিধি ১৮ তে বলা হচ্ছে। আদালত যদি প্লি­ডিংস সংশোধনের অনুমতি দিয়েও দেয় তাহলে- হয় আদেশে নির্ধারিত সময়ের ভেতরে অথবা আদেশে সময় উল্লে­খ না থাকলে আদেশের ১৪ দিনের ভেতরে এই সংশোধন করতে হয়। এর ভেতরে সংশোধন না করলে সংশোধনের সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। তবে, এক্ষেত্রেও আদালতের ক্ষমতা রয়েছে এটিকে বর্ধিত করার। আবারো এটি আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা।” [পৃষ্ঠা ৫৬৮-৫৬৯, একটি চিরুনি অভিযান – এমসিকিউ পর্ব]

আদেশ ৭, যেখানে আরজি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা আছে, তার সারসংক্ষেপ পড়ে নিতে পারেন। মূল বইয়ের হুবহু তুলে দিলাম আবারো। এখানে আরজি ফেরত ও আরজি নাকচের বিষয়টি আবারো উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে এটি ভালো কাজে দেবে বলে আশাবাদী। পড়ুন।

“… প্রথমেই ৭ আদেশটির সামগ্রিক পরিচয় নিলে দেখা যায় যে, বিধি ১ থেকে ৮ পর্যন্ত আরজির বিষয়বস্তু সম্পর্কিত বিধান, এর ভেতর ৬ বিধিতে তামাদি অব্যহতির অজুহাত এবং ৭ ও ৮ বিধিতে প্রতিকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা আছে। ৯ বিধিতে আরজি গ্রহণের পদ্ধতি এবং ১০ থেকে ১৩ পর্যন্ত বিধিগুলোতে আরজি ফেরত ও আরজি নাকচের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ দুইটি ধারণা সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। আর ১৪ থেকে ১৮ বিধিতে আরজির সাথে সম্পর্কিত দলিলসমূহ কিভাবে উপস্থাপন করতে হবে সে বিষয়ে বলা আছে। খুবই কমপ্যাক্ট ধারাবাহিকতা আছে এই বিধিগুলোতে। মনে রাখা কিন্তু কঠিন নয়।

একটি আরজিতে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে সে সম্পর্কে অতি পরিষ্কার ভাষাতেই ৭ আদেশের ১ বিধিতে বলা আছে। আপনি যদি এই বিধিতে বর্ণিত বিষয়গুলোর সাথে মিলিয়ে কয়েকটি বাস্তব আরজি দেখেন, তাহলে এই বিষয়গুলো অন্ধের মতো মুখস্থ করার দরকার পড়বে না এবং সেটা মনেও থাকবে ভালো। এজন্য কষ্ট করে কোর্টে গিয়ে সিনিয়রের কাছ থেকে কয়েকটি নমুনা আরজি ফটোকপি করে নিয়ে এসে পড়তে পারেন। আমরাও এই লেকচারের শেষে একটি আরজির নমুনা দিলাম; মিলিয়ে নেবেন ১ বিধিটির সাথে। অর্থের মোকদ্দমায় অর্থের যথাযথ পরিমাণ এবং স্থাবর সম্পত্তির মোকদ্দমায় সম্পত্তির চৌহদ্দি বা রেকর্ডে উল্লি­খিত সংশ্লিষ্ট নম্বর উল্লে­খ করতে হবে আরজিতে [বিধি ২ ও ৩]। আরজিতে বর্ণনা এমন হতে হবে যা দ্বারা বোঝা যাবে যে, বিবাদীর স্বার্থ ও দায়িত্ব আছে উক্ত বিরোধীয় বিষয়ে এবং সে কারণেই বিবাদী উক্ত মোকদ্দমায় হাজির হতে বাধ্য [বিধি ৫]। আমরা এর আগের লেকচারে দেখে এলাম যে, মোকদ্দমা দায়েরের পদ্ধতি সম্পর্কে ৪ আদেশে বলা আছে। কিন্তু এই ৭ আদেশের ৯ বিধিতে আরজি গ্রহণের পদ্ধতি সম্পর্কে বর্ণিত আছে বিস্তারিত। এই ৯ বিধির বিষয়বস্তুটি মনে রাখা অবশ্য কর্তব্য। এই বিধিটির সাথে ৪ আদেশটি ও ২৬ ধারা আবারো একবার দেখে নিলে কিন্তু বোঝাপড়াটা দৃঢ় হয়। দেখে নিন না এখনই!

যদিও ১ বিধিতে বলেছে যে একটি আরজিতে কী কী লাগবে, তথাপি বিধি ১ থেকে ৮ পর্যন্ত পর্যালোচনায় একটি আরজির মূল যে কাঠামো দাঁড়ায় সেটা নিম্নরূপ:

১. মোকদ্দমার পক্ষ [মোকদ্দমায় দুইটি পক্ষ থাকবে বলাই বাহুল্য! এই দুই পক্ষের নাম ঠিকানা বাসস্থান ইত্যাদি উল্লে­খ করতে হবে।]
২. মোকদ্দমা উদ্ভবের কারণ [[cause of action], [ঘটনার সংক্ষিপ্ত ও প্রাসঙ্গিক বর্ণনাসমেত মোকদ্দমার কারণ যেভাবে উদ্ভব হলো তার বিবরণ]
৩. মোকদ্দমার মূল্য নির্ধারণ [মোকদ্দমার বিরোধীয় বিষয়বস্তুটি কত মূল্যের এটি নির্ধারণ করে উল্লে­খ করতে হবে। আদালতের এখতিয়ার এবং প্রতিকারের উদ্দেশ্যে এটি অতীব জরুরি।]
৪. আদালতের এখতিয়ার [যে আদালতে মোকদ্দমাটি দায়ের করা হবে, মোকদ্দমার মূল অনুযায়ী সেই আদালতের এখতিয়ার আছে কিনা সেটি দেখতে হবে, এবং সে হিসেবে উক্ত আদালতেই মোকদ্দমাটি দায়ের করতে হবে। আদালতের নাম আরজির শুরুতেই উল্লে­খ করতে হয় বিধায় মোকদ্দমার ঘটনা ও মূল্য নির্ধারণ করে শুরুতেই এটি নির্ধারণ করে নিতে হয়।]
৫. তামাদি দ্বারা বারিত কি না [৭ আদেশের বিধি ৬ মোতাবেক কোনো একটি বিরোধ তামাদি দ্বারা বারিত হয়েছে কিনা সেটিও উল্লে­খ করতে হয় আরজিতে।]
৬. প্রার্থিত প্রতিকার [৭ আদেশের ৭ ও ৮ বিধিতে এ বিষয়ে পরিষ্কার করে বলাই আছে যে, প্রার্থিত প্রতিকার স্পষ্টভাবে উল্লে­খ করতে হবে]

উপরোক্ত বিষয়গুলো একটি আরজির অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। তবে প্লি­ডিং পড়ার সময় আমরা দেখেছিলাম যে, যেকোনো প্লি­ডিং এ [বাদীর জন্য প্লি­ডিং মানে আরজি এবং বিবাদীর জন্য প্লি­ডিং মানে জবাব] অবশ্যই পক্ষ এবং উকিলের স্বাক্ষর লাগবে। আরো লাগবে সত্যপাঠ। এগুলোও আরজির জন্য আবশ্যকীয়। তবে এগুলোর উল্লে­খ প্লি­ডিং সম্পর্কিত আদেশ ৬ এ উল্লে­খ করা আছে বিস্তারিত। জাস্ট স্মরণ করিয়ে দিলাম আরেকবার। রিলেট করে করে মনে রাখবেন, সারাজীবনেও ভুলে যাবার কথা না।

এবার আরো জরুরি একটি বিষয়। বিধি ১০ থেকে ১৩ এই চারটিতে আরজি ফেরত ও আরজি নাকচ সম্পর্কে বর্ণিত আছে। এটি নিয়ে খানিকটা বিস্তারিত পাঠ আমাদেরকে নিতে হবে।

আরজি ফেরত সংক্রান্ত ১০ বিধিটি পাঠ করলে এ রকম দাঁড়ায়- মোকদ্দমার যেকোনো পর্যায়েই আদালত আরজি ফেরত দিতে পারে। ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই- যে আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করা দরকার ছিলো সেই আদালতে মোকদ্দমাটি দায়ের বা দাখিল করার জন্য! ১০ বিধিটির ১ উপবিধিতে এটুকুই বলা আছে। আর এর ২ উপবিধিতে একটি আরজি ফেরত দেওয়ার সময় আদালতের করণিক কর্তব্য উল্লে­খ করা আছে। খুব সিম্পল।

আরজি ফেরত নিয়ে এই ১০ বিধিটির বাইরে দেওয়ানি কার্যবিধির আর কোথাও কোনো উল্লে­খ নেই। ১০ বিধিটি আবারো ভালো করে পড়লে দেখবেন যে, আরজি ফেরতের ভিত্তিসমূহের বিস্তারিত কিছু বলা নাই। তবে বিধিটির বিশ্লে­ষণে ও ব্যবহারিক পর্যায়ে বোঝা যায় যে, একটি মামলা কোনো ভুল আদালতে দাখিল হয়ে থাকলে [যেমন, হয়তো উক্ত আদালতের আর্থিক এখতিয়ার নেই বা আঞ্চলিক এখতিয়ার নেই, বা এমনও হতে পারে যে, উক্ত বিষয়বস্তুর মোকদ্দমাটি বিচার করার অথবা আপিল শোনার এখতিয়ার নেই ইত্যাদি] আরজিটি ফেরত দেওয়া যেতে পারে। এবং মোকদ্দমার যেকোনো পর্যায়ে এটি ফেরত দেওয়া যায়।

কিন্তু এই ফেরতের পরবর্তী ফলাফলটি কি? উক্ত মোকদ্দমার প্রার্থিত প্রতিকার কি পাবে না প্রতিকারপ্রার্থী? পাবে! আরজিটি ফেরত দেয়াই হয় এজন্য যেন সঠিক বা যথাযথ আদালতে [proper court] মোকদ্দমাটি দায়ের করা যায়। আরজি ফেরত এর ইংরেজি শব্দবন্ধটি খেয়াল করুন- Return of plaint। তার মানে, আরজিটি জাস্ট ফেরত দেওয়া। এর মানে আরজি নাকচ [Rejection of plaint] করা নয় কিন্তু! আরজি নাকচ কি সেটা নিয়ে ১১ থেকে ১৩ পর্যন্ত আলোচনা আছে। আরজি ফেরত হলে সেই একই আরজিটি অন্য যথাযথ আদালতে পেশ করা যাবে। নতুন যথাযথ আদালতটি পূর্বের ভুল আদালতের এ বিষয়ক নোট দেখে বুঝবেন যে, মোকদ্দমাটি ভুল আদালতে দায়ের হয়েছিলো। এ রকম আরজি ফেরতের ক্ষেত্রে ফেরতদানকারী আদালতটি আরজির উপরে-

১. আরজিটি দাখিলের তারিখ
২. আরজিটি ফেরতের তারিখ
৩. দাখিলকারী পক্ষ তথা বাদীর নাম
৪. আরজিটি ফেরতের কারণ

– এই চারটি বিষয় উল্লে­খ করবেন অবশ্যই। নতুন আদালত এসব দেখেই মোকদ্দমাটি গ্রহণ করবেন। এর ভেতরে তামাদির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তামাদি আইনের ১৪ ধারার বিধানমতে বাদীপক্ষকে দরখাস্ত দিতে হবে এই মর্মে যে, ভুল আদালতে দাখিলের কারণে সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। সুতরাং ভুল আদালতে দাখিলের দিনের তারিখেই মামলাটির দায়েরের সময় ধরে নিতে হবে। এই আবেদন আইনসম্মত, বৈধ। আদালত তামাদি আইনের ১৪ ধারার বিধান মোতাবেক শর্ত পূরণ হলে সেটি মঞ্জুর করবেন এবং মামলাটি গ্রহণ করে অগ্রসর হবেন। আরজি ফেরতের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল আদালতে আপিল করতে পারবেন। কারণ এটি একটি আপিলযোগ্য আদেশ। এই তথ্যটি বিশেষভাবে মনে রাখবেন।

এবার আসুন, আরজি নাকচ [Rejection of plaint] বুঝবো। ৭ আদেশের ১১ বিধিতে পরিষ্কার করে বলাই আছে কোন ৪টি কারণে আরজি নাকচ হবে। তবে এই মাত্র ৪টি কারণের বাইরেও আরো আরো কারণেও আরজি নাকচ হতে পারে। এই ৪টি কারণই শেষ নয়। আরজি নাকচ হতে পারে নিম্নোক্ত কারণে-

১. আরজিতে মোকদ্দমার কারণ উল্লে­খ না থাকলে [মোকদ্দমার কারণ উল্লে­খতো আরজির আবশ্যকীয় উপাদান। এটা না থাকলে ক্যামনে কি?! আরজিতো নাকচ হবেই!]
২. আরজিতে দাবিকৃত প্রতিকার যদি অবমূল্যায়ন করে দেখানো হয় বা মূল্য সঠিকভাবে না লেখা হয়
৩. আরজিতে মোকদ্দমার জন্য প্রয়োজনীয় বা যথাযথ মূল্যের স্ট্যাম্প বা কোর্ট ফি লাগানো না হলে
৪. আরজিতে বর্ণিত প্রতিকার প্রার্থনা যদি আইন দ্বারা বারিত বা নিষিদ্ধ হয়ে থাকে
৫. আরজিতে আরজির অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান যেমন, বাদীর স্বাক্ষর বা সত্যপাঠ ইত্যাদি না থাকলে

১১ বিধিতেই উপরোক্ত প্রথম ৪টি কারণ উল্লে­খপূর্বক পরের প্যারায় স্ট্যাম্প বিষয়ে বলা হয়েছে যে, প্রয়োজনীয় স্ট্যাম্প সরবরাহের জন্য ২১ দিনের বেশি সময় দেওয়া যাবে না। তার মানে অপর্যাপ্ত স্ট্যাম্প থাকলে আদালত আরজি নাকচ করার আগে পর্যাপ্ত স্ট্যাম্প যুক্ত করার জন্য ২১ দিনের সময় দেবেন। ২১ দিনের ভেতর স্ট্যাম্প যুক্ত করে দিলে আরজিটি গ্রহণ করা হবে। না দিলে উক্ত আরজিটি নাকচ হয়ে যাবে। আরজি নাকচের ক্ষেত্রে আদালত এর কারণ উল্লে­খপূর্বক নথিতে একটি আদেশ লিপিবদ্ধ করবেন আরজিটি সম্পর্কে। এই পদ্ধতিটি ১২ বিধিতে বলা আছে।

আরজি ফেরতের ক্ষেত্রে যথাযথ আদালতে আরজিটি নিয়ে গেলেই মোকদ্দমাটি দায়ের করা যায়। আরজি নাকচের ক্ষেত্রে কি হবে? আরজি নাকচের ক্ষেত্রে আরজি নাকচকারী আদালতটি উক্ত বাদীকে নতুন আরজি দাখিল করা থেকে বিরত করতে পারবেন না। ১৩ বিধিতে এটি বলা আছে। তার মানে, আরজি নাকচ হয় আরজিতে মূলত কোনো না কোনো ভুলের কারণে। উক্ত ভুলটি ঠিক করে নিয়ে একজন প্রতিকারপ্রার্থী আবারো প্রতিকার প্রার্থনা করতে পারে।

আরজি ফেরত এবং আরজি নাকচ বুঝলেন আশা করি। আরেকটি ধারণার সাথে এই দুইটিকে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলেন। সেটা হলো- মামলা বা মোকদ্দমা খারিজ! এটা নিয়ে এখন আর আলোচনা নয়। শুধু খেয়াল রাখেন এই তিনটির ইংরেজিগুলো- আরজি ফেরত [Return of plaint], আরজি নাকচ [Rejection of plaint] এবং মোকদ্দমা খারিজ [Dismissal of suit]। প্রথম দুইটিই আলোচনা করে এলাম ওপরে। দুটোই আরজি বা plaint সম্পর্কিত। আর শেষেরটা মোকদ্দমা বা suit নিয়ে। এ নিয়ে পরে প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচনা আসবে।” [পৃষ্ঠা ৫৭১-৫৭৩, একটি চিরুনি অভিযান – এমসিকিউ পর্ব]

এবারে আদেশ ৮ যেখানে লিখিত জবাব এবং সেট অফ নিয়ে বিস্তারিত আছে। মূল বই থেকে আবারো এর সারসংক্ষেপ হাজির করা হলো।

“… অন্য আরো অনেক বিষয়বস্তুর মতোই ‘লিখিত জবাব’ এর কোনো সংজ্ঞা দেওয়ানি কার্যবিধিতে দেওয়া নেই। তবে লিখিত জবাব বা জবাব হলো বিবাদীর প্লি­ডিংস, যা কিনা বাদীর আরজির বিপরীতে একজন বিবাদী আনুষ্ঠানিকভাবে তার বক্তব্য আদালতকে জানায়। আরজির মতো এটিও লিখিতভাবে আদালতকে জানাতে হয়। ৮ আদেশের ১ বিধির ১ উপবিধিতে মূলত লিখিত জবাব কতদিনের ভেতর আদালতে দিতে হবে সে বিষয়ে বলা আছে। বিধিটি মতে, বিবাদীর ওপর সমন জারি হবার পর থেকে ৩০ দিনের ভেতর আত্মপক্ষ সমর্থনপূর্বক জবাব দানের বাধ্যবাধকতা আছে; তবে আদালত কর্তৃক তা অন্য দিনেও বা বর্ধিত সময়েও দিতে পারে। কিন্তু এই বর্ধিত সময় কোনোক্রমেই ৬০ দিনের বেশি হবে না সমন জারির দিন থেকে। আর উক্ত ৬০ কর্মদিবসের ভেতরে জবাব দাখিল করতে না পারলে আদালত মামলাটি একতরফা নিষ্পত্তি করতে পারবে

১ বিধিটির ২ উপধারাতেই সেট অফ নামক শব্দ আছে। জরুরি বিষয়। সেট অফের ভালো বাংলা হলো দাবি সমন্বয়। এর মানে হলো- বাদী কর্তৃক দাবিকৃত বিষয়ের বিরুদ্ধে বিবাদীরও কোনো দাবির অস্তিত্ব থাকা। বাদী যদি কোনো টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে মোকদ্দমা করে থাকে এবং সেক্ষেত্রে যদি বিবাদীরও কোনো দাবি থাকে বাদীর কাছ থেকে, তখন বিবাদী বাদীর বিরুদ্ধে সেট অফ বা দাবি সমন্বয়ের আবেদন আদালতে করতে পারে। ৮ আদেশটির ৬ বিধিতে এর বিস্তারিত সংজ্ঞা ও ফলাফল-পরিণতি সম্পর্কে বলা আছে। অনেকগুলো উদাহরণও দেওয়া আছে। একটি উদাহরণে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে নিতে পারেন। ধরা যাক, আপনি করিমের বিরুদ্ধে ২০,০০০/- টাকা ক্ষতিপূরণের মোকদ্দমা করলেন। করিম এখানে বিবাদী। করিমও আপনার কাছে ৫,০০০/- পাবে। কিন্তু আপনি সেটা আরজিতে উল্লে­খ করেননি। উল্লে­খ না করাটাই স্বাভাবিক, এটা দোষেরও কিছু নেই। কিন্তু করিম ভাববে যে, এই মোকদ্দমায় আদালতের রায় আপনার পক্ষে গেলে তাকে ২০,০০০/- পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু আপনার কাছ থেকে পাওনা ৫,০০০/- টাকার কি হবে? উক্ত ৫,০০০/- টাকার নায্য দাবি যেন করিমও করতে পারে সেজন্যই এই সেট অফ বা দাবি সমন্বয় এর বিধান আছে দেওয়ানি কার্যবিধিতে। ক্লিয়ার?

কিন্তু এই দাবিটি সে কিভাবে করবে? বিবাদীকে এই দাবিটি লিখিত জবাব দেওয়ার সময় পরিষ্কার করে উল্লে­খ করতে হবে বা দাবি করতে হবে। আদালত তখন শুনানির মাধ্যমে এটি নিরূপণ করবেন। আবার লিখিত জবাবে এমন সেট অফ বা দাবি সমন্বয়ের দাবি করা হলে উক্ত লিখিত জবাবটিই এক্ষেত্রে আরজির মর্যাদায় গ্রহণযোগ্য হবে, যেটির জন্য কিনা আবার বাদী জবাব দিতে পারবেন, যদি বাদী তা অস্বীকার করে থাকেন। আদালত উভয় পক্ষেরই দাবি বিষয়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করতে পারবেন বিচারকাজের প্রক্রিয়ায়।

এই দাবি সমন্বয়ের মাধ্যমে বাড়তি বা অতিরিক্ত মোকদ্দমার উদ্ভব হতে বাধা সৃষ্টি করে। দাবি সমন্বয়ের বিধান না থাকলে উদাহরণের উক্ত মি. করিম কিন্তু আপনার বিরুদ্ধেও একটি মোকদ্দমা দায়ের করে ফেলতো।

তাহলে, সেট অফ বা দাবি সমন্বয়ের বেসিক ব্যাপারটা আমাদের বোঝা হয়ে গেলো। এটি মূলত ৮ আদেশের ৬ নং বিধির বিষয়বস্তু। কিন্তু আমরা মূলত আলোচনায় ছিলাম ৮ আদেশের ১ বিধির ২ উপবিধি নিয়ে। সেখানে সেট অফ নিয়ে যা বলছে তার মূল কথা হলো- কোনো এরূপ দাবি সমন্বয় থাকলে তার সাথে সংশ্লিষ্ট দলিলসমূহ লিখিত জবাবের সময় আদালতে উপস্থাপন করতে হবে এবং সেগুলো লিখিত জবাবের সাথে সংযুক্ত করে নথিভুক্ত করার আবেদন করতে হবে। ১ বিধিটির অবশিষ্ট অন্যান্য উপবিধিতে এই সেট অফ বা দাবি সমন্বয় নিয়েই বিস্তারিত বলা আছে। সেগুলো পড়ে নিন, বুঝে নিন। এবাদে অন্যান্য বিধিগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলার নেই। …” [পৃষ্ঠা ৫৭৫-৫৭৬, একটি চিরুনি অভিযান – এমসিকিউ পর্ব]