২২ নভেম্বর, শুক্রবার, ৩ টায়, ফার্মগেট, ঢাকায়

বার কাউন্সিল প্রস্তুতি বিষয়ক
উন্মুক্ত সেমিনার!

আসন বুকিং দিন : 01712-908561

Penal Code : Lecture 001 

Essential elements of crime : অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ

ম্যাপিং : সিলেবাসে দণ্ডবিধির প্রথম বিষয়টি হলো Essential elements of crime বা অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ। কিন্তু পেনাল কোড শুরু হয়েছে এর ‘সূচনা’ শিরোনামে যেখানে মূলত এই কোডের আওতা, পরিধি ও অন্যান্য সম্পর্কিত বিষয়সমূহ বর্ণনা করা আছে। পেনাল কোডের আমাদের প্রথম লেকচারটিতে মূলত সিলেবাসে বর্ণিত বিষয়ের বাইরে পেনাল কোডের সাধারণ পরিচয় সংক্রান্ত আলোচনা করবো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিগত এমসিকিউ পরীক্ষাগুলোতে মোট ৪ টি প্রশ্ন এসেছিলো এই সংক্রান্ত।

মূল আলোচনা
Penal মানে দণ্ড বা দণ্ড সম্পর্কিত। মানে শাস্তি বা শাস্তি সম্পর্কিত। শাস্তি সম্পর্কিত বিধি হিসেবেই পরিচিত এই পেনাল কোড। ইংরেজিতে পেনাল শব্দের অর্থ এখানে দেখে রাখুন –

pe·naladjective : relating to, used for, or prescribing the punishment of offenders under the legal system. [the campaign for penal reform]

এই আইনে সমাজে প্রচলিত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের সংজ্ঞা বা বিবরণ, এই সমস্ত অপরাধের উপাদান, শাস্তির পরিমাণ ও মেয়াদ ইত্যাদি সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে। ১৮৬০ সালে ৬ অক্টোবর এই আইন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রণয়ন করা হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। তবে, এটি কার্যকর করা হয় ১৮৬২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। তার মানে, ১৮৬২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে যদি কোনো অপরাধ দণ্ডবিধির সংজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত হয় বা কেউ এই বিধিতে সংজ্ঞায়িত কোনো অপরাধ সংঘটন করে তবে তাকে এই অনুযায়ী শাস্তি পেতে হবে। এই  আইন সামান্য কিছু পরিবর্তন সাপেক্ষে বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে প্রচলিত আছে। ১৮৬০ সালের ৪৫ নং আইন এটি। ধারা আছে ৫১১ টি।

আইনের প্রধান দুইটি প্রকারভেদ হলো – তত্ত্বগত আইন (Substantive Law) ও পদ্ধতিগত আইন (Procedural Law)। যে আইনে মূলত বিভিন্ন বিষয় এর সংজ্ঞা ও উপাদানসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয় তাই-ই তত্ত্বগত আইন। আর যে আইনে কোনো তত্ত্বগত আইন কিভাবে প্রয়োগ হবে তার পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা করা থাকে তাকে পদ্ধতিগত আইন বলে। পেনাল কোড মূলত একটি Substantive Law বা তত্ত্বগত আইন। এই কথাটা দয়া করে ভুলবেন না কখনো। পরে ফৌজদারি কার্যবিধি পড়তে গিয়ে আরো পরিষ্কার হবে বা তুলনামূলক উপলব্ধি করতে সুবিধা হবে। পরের বিষয় পরে! 🙂

প্রথম চ্যাপ্টারে বর্ণিত মূল ধারাগুলো দেখে নেই একবার। বলা যায়না কখন কোন জিনিস কাজে লেগে যাবে! জাস্ট একটা রিডিং দেন।

“প্রথম অধ্যায় : সূচনা

প্রস্তাবনা
যেহেতু বাংলাদেশের জন্য একটি সাধারণ দণ্ডবিধির ব্যবস্থা করা সমীচীন এবং প্রয়োজনীয়; সেহেতু নিম্নরূপ আইন প্রণয়ন করা হল :

প্রস্তাবনায় প্রস্তাবনার কথাটি একদম পরিষ্কারভাবে বলেছে যে, দণ্ড বা শাস্তির একটি সাধারণ-সার্বজনীন বিধি প্রণয়নের জন্যই আলোচ্য আইনটি প্রণয়ন করা হলো। কথাটি এককথায় বলে দিয়েছে। এর পেছনের ইতিহাসটি বিস্তারিতভাবে লেখা যেতো। আইনশাস্ত্রের বিপুল বিকাশের এই কালে তার প্রয়োজনীয়তা অবশ্য খুব একটা নেই। আমরা এই ইতিহাস খুব সংক্ষেপে লিখেছিলাম দণ্ডবিধির প্রারম্ভিক আলোচনায়। আবার পড়ুন এখানে।

ব্রিটিশ শাসনামলে বিশালাকার ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও ধর্মগোষ্ঠীর বসবাস ছিলো যারা কিনা প্রত্যেকেই নিজেদের ধর্মীয় রীতিনীতির আলোকে তাদের বিচার ব্যবস্থা চালু রেখেছিলো। হিন্দু ও মুসলিম আইনী কাঠামোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার হতো। ১৮০০ সালের শুরুর দিকের দশকগুলোতে বিশেষ করে নগরকেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোতে যদিও ব্রিটিশ প্রবর্তিত বেশি কিছু বিধিবিধান চালু ছিলো, তথাপি দেখা যায় যে, পুরো ভারতবর্ষের জন্য অনেক নিত্যনতুন সমস্যায় উক্ত আঞ্চলিক বা সম্প্রদায়গত আইনকানুন বা এমনকি ব্রিটিশ আইনও যথাযথ প্রতিকার দিতে পারতো না কোনো ফৌজদারি অপরাধ বা দেওয়ানি অধিকারের বিষয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচারকগণ নিজস্ব বিবেক-বুদ্ধি ও সুবিবেচনা প্রয়োগ করে প্রতিকার দিতেন। এই অসামঞ্জস্যতা দূর করার জন্য একটি একক পদ্ধতিগত ও লিখিত বিধানাবলীর প্রয়োজনীয়তা আবশ্যিক হয়ে উঠলো। প্রচলিত সমস্ত এ্যাক্ট, রেগুলেশন ও আইনসমূহকে লিখিত আকারে কোডিফিকেশন করার জরুরৎ দেখা দিলো।

উপরোক্ত এই প্রয়োজনকেই প্রস্তাবনায় লেখা হয়েছে এভাবে – “যেহেতু বাংলাদেশের জন্য একটি সাধারণ দণ্ডবিধির ব্যবস্থা করা সমীচীন এবং প্রয়োজনীয়; সেহেতু নিম্নরূপ আইন প্রণয়ন করা হল”। ক্লিয়ার?

এবার ১ ও ২ নং ধারাটি দেখুন।

ধারা ১ : শিরোনাম এবং কার্যকারিতার সীমানা : এ আইন ‘দণ্ডবিধি’ নামে অভিহিত হবে এবং এটা সমগ্র বাংলাদেশে কার্যকর হবে।

ধারা ২ : বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত অপরাধসমূহের দণ্ড : প্রত্যেক ব্যক্তি বাংলাদেশের ভেতরে এ বিধির বিধানাবলীর পরিপন্থি যে কার্যাদি কিংবা বিচ্যুতির জন্য [for every act or omission contrary to the provisions] অভিযুক্ত বলে বিবেচিত হবে, তার প্রত্যেক কাজ বা বিচ্যুতির জন্য এ বিধির অধীনে এবং প্রকারান্তরে নয়, দণ্ডনীয় হবে।

ধারা ১ এ এই আইন কি নামে পরিচিত হবে এবং তার কার্যকারিতার সীমা বা আওতা বলা হয়েছে। এটা ‘দণ্ডবিধি’ নামে পরিচিত হবে এবং তা সমগ্র বাংলাদেশে কার্যকর হবে।

ধারা ২ এ এসে আরেকটু জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো ব্যক্তি যদি দণ্ডবিধির পরিপন্থী কোনো কাজ করে বা দণ্ডবিধি অনুযায়ী কোনো অপরাধ করে তবে তাকে এই আইন অনুসারে দণ্ডিত করা যাবে। প্রাথমিক জোর [emphasis] দেয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরে’ এই শব্দবন্ধের ওপরে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখবেন আরেকটা খুব জরুরি কথা এখানে বলা আছে। ‘কার্যাদি বা বিচ্যুতির জন্য’ [act or omission]। এর মানেটা এখানেই খানিক বিস্তারিত বুঝে নেবো, কেননা, এই ‘কার্যাদি বা বিচ্যুতি’ শব্দগুলো ফৌজদারি অপরাধ সম্পর্কে আলোচনায় বারেবারে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যাপারটা এখুনি বুঝে নিলে পরের দিকে অন্য আলোচনায় বারেবারে সেটাকে আর বোঝার দরকার পড়বে না।

দণ্ডবিধিতে ‘কার্য; বিচ্যুতি’ শিরোনামে একটি ধারা আছে। ধারা ৩৩। ধারাটি দেখুন।

“ধারা ৩৩ : কার্য; বিচ্যুতি : কার্য বলিতে একক কার্য হিসেবে কার্যসমূহের শ্রেণীকেও বোঝাবে। বিচ্যুতি বলিতে একক বিচ্যুতি হিসেবে বিচ্যুতিসমূহের শ্রেণীকেও বোঝাবে।

যদি কিছু না বুঝে থাকেন, হতাশ হবেন না। কেননা, এখানে কার্য এবং বিচ্যুতির কোনো সংজ্ঞা দেয়া নেই। বস্তুত ৩৩ ধারাটিতে কার্য এবং বিচ্যুতির পরিধি বর্ণনা আছে মাত্র। কিন্তু আমাদের এর সহজ সংজ্ঞাগত উপলব্ধি দরকার।

সাধারণভাবে ইংরেজিতে act বলতে কোনো কাজ করা বোঝায় (to do something)। অন্যদিকে omission বলতে কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকা বোঝায়। কিন্তু আইনে আরেকটু স্পেসিফিক অর্থে বিষয়টা আমাদেরকে বুঝতে হবে। আমরা কিছু উদাহরণে যেতে পারি।

কোনো মানুষের আপনি মৃত্যু কামনা করেন। আপনি সেই মৃত্যুকে বাস্তবায়ন করার জন্য কোনো কাজ (যেমন আপনি একটি চাকু দিয়ে তাকে খুন করলেন) করতে পারেন। তাহলে এই কাজটি (act) একটি অপরাধ। কেননা, দণ্ডবিধি অনুযায়ী এটি একটি ঘোষিত অপরাধ। আবার ধরা যাক, আপনি একজনের দেখভাল করার দায়িত্বে আছেন কোনো চুক্তি বা প্রথা অনুযায়ী। এই দেখভাল করতে গিয়ে আপনি ইচ্ছাপূর্বক তাকে খাবার খেতে না দিয়ে তাকে মৃত্যুর মুখে পতিত করলেন। এই যে আপনি তাকে খাবার খেতে না দিয়ে বা খাবার খেতে দেবার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থেকে (এটাও কিন্তু একটা কাজ) একজনকে মৃত্যুর মুখে পতিত করলেন সেটাও একটা অপরাধ। কেননা, আইন অনুযায়ী তাকে খাবার দেয়াটা আপনার দায়িত্বের মধ্যে ছিলো। নির্ধারিত দায়িত্ব পালন না করাটাই এক্ষেত্রে omission বা বিচ্যুতি বলে গণ্য হবে।

আরেকটা উদাহরণ দিলে আরো পরিষ্কার হবে বিষয়টি। যেমন, একজন পুলিশ অফিসার তার দায়িত্ব পালন না করে বসে থাকলো ইচ্ছাকৃতভাবেই। এই ‘বসে থাকাটা’ও একটা কাজ। পুলিশ অফিসারটি ইচ্ছাকৃতভাবে বসে থেকেই বা দায়িত্ব পালন না করে একটি অপরাধ করেছে। এই অপরাধের ইচ্ছা তার ছিলো এবং সেইটা সে নিষ্ক্রিয় থেকে বা বসে থেকে কার্যকর করেছে।

অর্থাৎ তৎপরতা বা কার্য কখনো কোনো কিছু করার মাধ্যমে হতে পারে আবার কোনো কিছু থেকে বিরত থাকার মাধ্যমেও হতে পারে। যখন তা কোনোকিছু করার মাধ্যমে হয়, তখন তা act বা কাজ বলে গণ্য হয়, আবার যখন আইনে নির্ধারিত দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা পালন করা হয় না, তখন তা omission বা বিচ্যুতি বলে গণ্য হয়। সহজ কথায় – `Doing nothing’ can be a way of doing something!

এবার ধারা ৩ এবং ৪ একসাথে পড়ে নেন।

ধারা ৩ : বাংলাদেশের বহির্ভাগে সংঘটিত কিন্তু আইনবলে বাংলাদেশের ভেতরে বিচারযোগ্য অপরাধসমূহের জন্য দণ্ড : বাংলাদেশের বহির্ভাগে সংঘটিত অপরাধের জন্য যে কোন বাংলাদেশী আইনবলে বিচারযোগ্য যে কোন ব্যক্তির বাংলাদেশের বহির্ভাগে সংঘটিত যে কোন কাজের জন্য বিধির বিধানসমূহ অনুযায়ী বিচার করা হবে যেন অনুরূপ কাজ বাংলাদেশের ভেতরে সংঘটিত হয়েছে।

ধারা ৪ : বিদেশে সংঘটিত অপরাধের জন্য বিধিটির আওতায় সম্প্রসারণ : নিম্নবর্ণিত ব্যক্তিসমূহের দ্বারা সংঘটিত কোন অপরাধের ক্ষেত্রেও এ বিধির বিধানসমূহ প্রযোজ্য হবে-
১) বাংলাদেশের বহির্ভাগে অবস্থিত কোন স্থানে বাংলাদেশের নাগরিক।
২) [সেন্ট্রাল ল’জ (এডোপশান) আদেশ, ১৯৬১ বলে বাতিলকৃত]।
৩) [বাংলাদেশ ল’জ (রিভিশন ও ডিক্লারেশন) আইন, ১৯৭৩ (১৯৭৩ সালের ৭নং আইন) এর ধারা ৩ এবং তফসিল বলে বাতিলকৃত]।

৪) বাংলাদেশে নিবন্ধিত যে কোন জাহাজ কিংবা বিমানপোতে আরোহী যে কোন ব্যক্তি, উক্ত জাহাজ বা বিমানপোতে যে স্থানেই হোক না কেন।

ব্যাখ্যা: যে কাজ বাংলাদেশের ভেতরে সংঘটিত হলে এ আইন মতে দণ্ডনীয় হতো, তা বাংলাদেশের বহির্ভাগে সংঘটিত হলে তাও অপরাধ কথাটির অন্তর্ভূক্ত হবে।

উদাহরণসমূহ:
ক) ‘ক’ বাংলাদেশের একজন নাগরিক। উগাণ্ডায় সে একটি খুনের অপরাধ সংঘটিত করে। বাংলাদেশের যে কোন স্থানে তার সন্ধান পাওয়া গেলে খুনের দায়ে তার বিচার দণ্ডদান করা যাবে।

খ) ‘খ’ একজন ইউরোপীয় বৃটিশ প্রজা। সে রংপুরে একটি খুনের অপরাধ সংঘটিত করে। বাংলাদেশের যে কোন স্থানে তার সন্ধান পাওয়া গেলে খুনের দায়ে তার বিচারও দণ্ডদান করা যাবে।

গ) বাংলাদেশ সরকারের অধীনে চাকুরিরত একজন বিদেশী নাগরিক ‘গ’ খুলনায় একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। বাংলাদেশের যে কোন স্থানে তার সন্ধান পাওয়া গেলে খুনের দায়ে তার বিচারও দণ্ডদান করা যাবে।

ঘ) খুলনায় বসবাসরত একজন বৃটিশ নাগরিক ‘ঘ’ চট্টগ্রামে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার জন্য ‘ঙ’ কে প্ররোচিত করে। ‘ঘ’ হত্যাকাণ্ড প্ররোচনা দানের অপরাধে দোষী।

ধারা ৩ এবং ৪ এর মূল কথাটা এভাবে প্রকাশ করা যায় – বাংলাদেশে কোনোভাবে একজন বিদেশী ব্যক্তি অপরাধ করলে, অথবা উল্টোভাবে বাংলাদেশের কোনো একজন ব্যক্তি দেশের বাইরে কোনো জায়গায় কোনো অপরাধ করলে, যা কিনা বাংলাদেশের আইনে অপরাধ বলে বিবেচিত হয়, যদি তাকে বাংলাদেশে পাওয়া যায়, তবে তার বিচার বাংলাদেশের আদালত করতে পারবে। এখানে মূল বিবেচ্য বিষয় হলোউক্ত অপরাধটি বাংলাদেশের আইনে অপরাধ বলে বিবেচিত কি না। ৪ নং ধারাটি ও তার উদাহরণসমূহ আরেকবার পড়ুন, মনে রাখুন। কাজে দেবে নিশ্চিত।

এবার ধারা ৫।

ধারা ৫ : এ আইন কতিপয় আইনকে প্রভাবিত করবে না : এ আইনের কোন কিছুই প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিয়োজিত কর্মচারীগণ, সৈনিকগণ, নাবিকগণ, বৈমানিকগণের বিদ্রোহ ও পলায়নের শাস্তি বিধান সম্পর্কিত কোন আইন বা কোন বিশেষ বা স্থানীয় আইনের [of any special or local law] যে কোন বিধান বাতিল, রদবদল, স্থগিতকরণ বা ক্ষুণ্নকরণের জন্য অভিপ্রেত বলে বিবেচিত হবে না।”

দণ্ডবিধির এই ৫ ধারাটি আইনের অতি সুপ্রতিষ্ঠিত ‘Special law prevails over general law’ এই নীতিকে প্রকাশ করেছে। এর অর্থ হলো – কোনো বিশেষ আইনের বিধিতে কোনো প্রক্রিয়া, সংজ্ঞা বা শাস্তির বিধান উল্লেখ থাকলে সাধারণ আইনের বিধান সেক্ষেত্রে প্রভাব তৈরি করবে না বা সাধারণ আইন অনুযায়ী উক্ত শাস্তি বা প্রক্রিয়া নির্ধারিত না হয়ে উক্ত বিশেষ আইন দ্বারাই নির্ধারিত হবে!

এই ধারাটি যেহেতু আইনের একটি মৌলিক নীতিকে প্রকাশ করেছে, সেহেতু এটা আরেকটু বিস্তারিত ভেঙ্গে ভেঙ্গে বুঝে নিতে পারি আমরা। সাধারণ আইনের কোনো সংজ্ঞা দেয়া নেই কোথাও। তবে বিশেষ আইন ও স্থানীয় আইনের সংজ্ঞা পাওয়া যায় দণ্ডবিধির ৪১ ও ৪২ ধারায়। ৪১ ধারাটি নিম্নরূপ –

“ধারা ৪১ : বিশেষ আইন : কোনো বিশেষ বিষয়ের প্রতি প্রযোজ্য আইনকে ‘বিশেষ আইন’ বলে।[Section 41 : Special law : A “special law” is a law applicable to a particular subject.]

এর চেয়ে বেশি কিছু বলা নাই। অন্যদিকে স্থানীয় আইন সম্পর্কে ৪২ ধারাতে বলা আছে এভাবে –

“ধারা ৪২ : স্থানীয় আইন : শুধুমাত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরস্থ এলাকাসমূহের কোনো বিশেষ অংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনকে ‘স্থানীয় আইন’ বলে। [Section 42 : Local Law : A “local law” is a law applicable only to a particular part of the territories comprised in Bangladesh.]

স্থানীয় আইনের উদাহরণ হতে পারে – পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮, বা খুলনা মহানগরী পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ ইত্যাদি। অন্যদিকে বিশেষ আইনের উদাহরণ হতে পারে – নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, আর্মস এ্যাক্ট, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৫ ইত্যাদি।

বিশেষ আইনের উদাহরণের আইনগুলোতে লক্ষ্য করেন যে, যে সমস্ত বিষয়বস্তুর ওপর এই আইনগুলো তৈরি করা হয়েছে সেসব মূলত এক অর্থে সাধারণভাবে দণ্ডবিধির (আলোচনার এই অংশে দণ্ডবিধি একটি সাধারণ আইন বলে গণ্য হচ্ছে) বিষয়বস্তু। কিন্তু দেখা যায় যে, ধরা যাক, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিকে সংজ্ঞায়িত করা বা তার শাস্তির বিশেষ বিশেষ বিবেচনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে করা যায়নি দণ্ডবিধিতে। দণ্ডবিধিতে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত একেবারে বেসিক বিষয়বস্তুগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। সেক্ষেত্রে নারী ও শিশু সংক্রান্ত আলাদা আইন তৈরি করার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং তা তৈরিও হয় অবশেষে। তার মানে একটি সাধারণ ফৌজদারি আইনের (যেমন, দণ্ডবিধি) উপস্থিতির পরেও বিশেষভাবে আরেকটি বিষয়বস্তুর জন্য আইন তৈরি করা হচ্ছে। এই বিশেষভাবে তৈরি হওয়া আইনটিই বিশেষ আইন।

মূল ধারায় ফিরে যাই। ৫ ধারায় এটাই বলা হয়েছে যে, এরকম কোনো বিশেষ অথবা স্থানীয় আইনে যখন কোনো বিধান থাকে তখন সেই বিধানটিই কার্যকর হবে, সাধারণ আইনে যেটাই বলা হয়ে থাকুক না কেন। ধারাটিতে কথাটা এভাবে বলা হয়েছে যে, এই আইনের (মানে, দণ্ডবিধি) কোনো কিছুই উক্তরূপ বিশেষ বা স্থানীয় আইনের ওপর প্রভাব ফেলবে না। এর মানেবিশেষ বা স্থানীয় আইনের বিধানই প্রাধান্য পাবে।

কেন এই বিশেষ আইন প্রাধান্য পাবে, সে সম্পর্কে আরো পাতার পর পাতা লেখা যাবে। কারণ এর সাথে আইনের আরো বেশ কিছু মৌলিক নীতি জড়িত আছে। সেগুলো লিখিত পরীক্ষার সময় আমরা বিস্তার করবো, এমসিকিউ পর্বের জন্য সেগুলো জরুরি নয় আপাতত।

এইবার আসুন আমরা সিলেবাসে উল্লেখিত দণ্ডবিধির প্রথম বিষয়টি Essential elements of crime বা অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ নিয়ে আলোচনা করি। বাজারের প্রচলিত অনেক এমসিকিউ বইয়ে এটা নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা নেই। আবার অন্যান্য মূল বইয়ের বেশিরভাগই এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে একদমই আলোচনা করেনি। অপরাধ, তার সংজ্ঞা ও এর উপাদান নিয়ে একটি তাত্ত্বিক আইন আলোচনা পড়বেন কিন্তু অপরাধের উপাদান সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা জানবেন না, এটা ঠিক মানানসই না। তবে এটা নিয়ে অনেক বিস্তৃত আলোচনা সম্ভব হলেও সেটা এমসিকিউ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নয় তেমন। লিখিত পরীক্ষার জন্য আমরা আগামীবারে এটা নিয়ে অনেক বিস্তৃত আলোচনা করবো একটা সামগ্রিক উপলব্ধির জন্য। তো, সংক্ষিপ্ত আলোচনাটি নিম্নরূপ।

আইন সবসময়ই ন্যায় বিচার করতে চায়। ফলে প্রত্যেকটি অপরাধ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা সাপেক্ষেই আদালত তার বিচার করতে চায়। ফলে একটি অপরাধের ঘটনার সকল খুটিনাটি বিষয় নিয়ে আইনজীবী ও আদালত তাদের যুক্তিতর্ক হাজির করে। ফলে দুইটি একই ধরনের অপরাধের তীব্রতা ও পরিস্থিতি সাপেক্ষে দুইরকম মেয়াদের শাস্তি বা বিচার হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান অন্তত ন্যায়বিচারের স্বার্থে অনেক কিছু বিবেচনায় নেয়।

সাধারণভাবে অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান হলো দুইটি। একটি Mens rea বা দুষ্ট মন বা Guilty mind, অন্যটি Actus rea বা অপরাধমূলক কাজ বা Guilty act। খুব বিখ্যাত একটি ম্যাক্সিম আছে আইনে : “Actus non facit reum nisi mens sit rea” যার মানে হলো – দুষ্ট মন বা অপরাধী মন ছাড়া কোনো অপরাধ হতে পারেনা। অর্থাৎ একটি অপরাধের ইচ্ছা থাকতে হবে অপরাধকারীর। তা না হলে সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে না। কিন্তু শুধুমাত্র দুষ্ট মন বা অপরাধের ইচ্ছা কিন্তু একটি অপরাধকে সংঘটিত করে না। এটার জন্য তৎপরতা বা কার্য দরকার। এটাই হলো Actus rea বা কার্য।

বিভিন্ন বইয়ে অপরাধের উপাদান বা বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে আরো বলা হয়েছে – যেকোনো অপরাধের বহিস্থ ক্ষতিকর প্রভাব থাকতে হবে যা সামাজিক বা ব্যক্তিগত বা মানসিক হতে পারে। আবার সেই ক্ষতিকর প্রভাবটি সম্পর্কে আইনে উল্লেখ থাকতে হবে যা রাষ্ট্র কর্তৃক শাস্তিযোগ্য হিসেবেও নির্দিষ্ট থাকবে।

এককথায় এভাবে বলা যায় – যদি কোনো অপরাধের ইচ্ছা (দুষ্ট মন বা Mens rea) নিয়ে কেউ কোনো সমাজ-রাষ্ট্র-ব্যক্তির প্রতি ক্ষতিকর কিছু করে (Actus rea) যা কিনা আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তবেই একটি অপরাধ সংঘটিত হয়। প্রত্যেকটি অপরাধের ক্ষেত্রে এই সমস্ত কিছুর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। এগুলো ছাড়া কোনো অপরাধ সংঘটিত হতে পারে না।

সুতরাং আমরা অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোকে বলতে পারি এভাবে –

১. Mens rea বা দুষ্ট মন বা Guilty mind
২. Actus rea বা অপরাধমূলক কাজ বা Guilty act
৩. বিদ্যমান আইনে তা অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত হবে ও  আইনে তা শাস্তিযোগ্য হতে হবে।



এখানে অনুশীলন করুন।

Penal Code 01

কুইজটি শুরু করতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।