২২ নভেম্বর, শুক্রবার, ৩ টায়, ফার্মগেট, ঢাকায়

বার কাউন্সিল প্রস্তুতি বিষয়ক
উন্মুক্ত সেমিনার!

আসন বুকিং দিন : 01712-908561

Penal Code : Lecture 003

Acts done by several persons in furtherance of common intention : কতিপয় ব্যক্তি কর্তৃক একই উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কৃত কার্যাবলী

ম্যাপিং : আমাদের এবারের আলোচনার বিষয় Joint liability বা যৌথ দায়বদ্ধতা। তবে এটা পপুলারলি পরিচিত Common Intention নামে। সিলেবাসে বিষয়টি আছে এভাবে – ‘Acts done by several persons in furtherance of common intention’। অত্যন্ত জরুরি আলোচনা, সন্দেহ নেই। বিগত এমসিকিউ পরীক্ষাগুলোতে মোট ২টি প্রশ্ন আসলেও এর ধারণা রাখাটা যেকোনো আইনের শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক। এই টপিকের অন্তর্ভূক্ত বিষয় মূলত দণ্ডবিধির ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭ ও ৩৮ ধারা। আর এই ধারাগুলো দণ্ডবিধির ২ নং অধ্যায়ে সাধারণ ব্যাখ্যাসমূহ বা General Explanations এর অন্তর্ভূক্ত যা বিধিটির ৬ নং ধারা থেকে ৫২-ক ধারা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ২ নং অধ্যায়ে দণ্ডবিধিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধারণার ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সেসব আমরা আগের লেকচারেই আলোচনা করে আসলাম মাত্র।

মূল আলোচনা
বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধ বেশিরভাগই সংঘটিত হয় একাধিক ব্যক্তি দ্বারা। কাউকে মারধোর করা, ডাকাতি করা, ধর্ষণ কিংবা খুন, হুমকি যাই বলুন না কেন, প্রায় সবসময়ই একাধিক লোক যুক্তভাবে এই সমস্ত অপরাধ সংঘটিত করে। আবার, অপরাধ কেউ সরাসরি করলেও দেখা যায়, নির্দেশদাতা হিসেবে গোপনে কোনো লোক জড়িত আছে যিনি সরাসরি অপরাধের সাথে জড়িত নন বা সরাসরি স্পটে বা ঘটনাস্থলে থাকেন না। ফলে দেখা যায় একটি অপরাধমূলক কাজে বিভিন্ন লোকের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা থাকতে পারে, ফলে তাদের দায়ও ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হয়। তাদের দায় এর পরিমাণ নির্ধারণ অথবা যৌথভাবে একদল লোক কতটা দায়ী তা নির্ধারণের জন্য সাধারণ নীতি কি তা সুনির্দিষ্ট থাকা প্রয়োজন পড়ে। আর সেই প্রয়োজনটিই মূলত এই টপিকের আলোচনায় উঠে আসবে।

আগেই বললাম, ৩৪-৩৮ ধারা পর্যন্ত যৌথ দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত আলোচনা আছে। এই ধারাগুলো কোনো শাস্তি নির্ধারণ করেনি। বরং এটি কিছু নীতি বর্ণনা করেছে যৌথ দায়বদ্ধতা বা সাধারণ অভিপ্রায় সম্পর্কে

আমরা সরাসরি ৩৪ নং ধারাটির একটা পাঠ নেই।

“ধারা ৩৪: কতিপয় ব্যক্তি কর্তৃক একই উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কৃত কার্যাবলী : যখন কতিপয় ব্যক্তি মিলে সকলের একই অভিপ্রায় পূরণকল্পে কোন অপরাধমূলক কার্য সম্পাদিত হয়, তখন অনুরূপ ব্যক্তিগণের প্রত্যেকেই উক্ত কার্যের জন্য এরূপে দায়ী হবেন যেন উক্ত কর্ম উক্ত ব্যক্তি কর্তৃক একাকী সম্পাদিত হয়েছিল

একই অভিপ্রায়, মানে একই ইচ্ছায় / বাসনায় / উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যক্তি যখন কোনো অপরাধ করে, তখন প্রত্যেকেই সেখানে সমানভাবে দায়ী হবে। যখন একই অপরাধে অনেকেই একসাথে জড়িত থাকে, তখন প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কি কি ভূমিকা ছিলো ইত্যাদি সাপেক্ষে যেন সাধারণভাবে কোনো অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি থেকে রেহাই না পায়, তার নিশ্চয়তা দেবার জন্য বা ন্যায় বিচার দেবার জন্যই এই ধারাটির আবির্ভাব। কিন্তু অবশ্যই পূর্বের সাধারণ অভিপ্রায় বা ইচ্ছা থাকতে হবে উক্ত অপরাধটি সংঘটনের

এই ধারার নীতি কার্যকর ও প্রমাণ করতে চাইলে ৩ টি অপরিহার্য উপাদান আছে; এগুলোর যেকোনো একটি উপাদান অন্তত থাকতে হবে।

১. একাধিক লোক মিলে অপরাধজনক কোনো কাজ সংঘটিত হয়েছে কিনা
২. উক্ত একাধিক লোকেরা মিলে একসাথে ইচ্ছা প্রকাশ বা অভিপ্রায় করেছিলেন কিনা যে তারা অপরাধমূলক কাজটি ঘটাবেন
৩. সকলের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়কে সার্থক করার জন্য অপরাধটি শেষ পর্যন্ত সংঘটিত হয়েছে কিনা

এই ধারা সম্পর্কে দণ্ডবিধির বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে অনেক বিস্তারিত আলোচনা দেয়া আছে। খুব ভালো একটি বই থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করি একটি প্রয়োজনীয় উদাহরণ

“তিনজন ব্যক্তি ক এর নিকট কিছু পণ্য রাখিলেন। তাহারা উক্ত পণ্য ক এর নিকট দাবি করিলে ক তাহা দিতে অস্বীকার করেন। অত:পর উক্ত তিনজন ব্যক্তি একইসঙ্গে ক ও তাহার স্ত্রীকে হত্যা করিলেন। এমতাবস্থায় উক্ত তিনজনের মধ্যে কাহার অস্ত্রে মৃত্যু ঘটিয়াছে, তাহা না জানা গেলেও বা একজনের নিকটে অস্ত্র না থাকিলেও সকলেই সমান দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন। কারণ সকলেই এক অভিপ্রায়ে সম্মিলিতভাবে উক্ত অপরাধমূলক কাজ করিয়াছেন

কে কোন আঘাতটি করিয়াছিলেন এবং কাহার আঘাতে মৃত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন তাহা নির্ণয় করা অপ্রয়োজন। কারণ বর্তমান ধারায় বিদ্ধৃত সূত্রানুযায়ী আক্রমনকারীর প্রত্যেকেই সমগ্র অপরাধটির জন্য দায়ী হইবেন।”

আশা করি উপরের এই একটা উদাহরণই যথেষ্ট ৩৪ ধারা উপলব্ধির জন্য। এর আরো গভীর উপলব্ধি আমাদের প্রয়োজন পড়বে, কিন্তু সেটা অন্য আরো কিছু ধারা পাঠ হলে তখন সেটা স্পষ্ট হবে। প্রসঙ্গত জেনে রাখি, ৩৪ ধারার সাথে সম্পর্কিত আরো কিছু সমজাতীয় ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে ১০৭ – ১২০, ১৪৯, ১২০-ক, ৩৯৬, ৪০৬ ইত্যাদি ধারাগুলোতে।

এবার ৩৫ ধারা।

“ধারা ৩৫ : যেক্ষেত্রে অনুরূপ কার্য কোন অপরাধমূলক জ্ঞান বা অভিপ্রায় সহকারে সম্পাদিত হওয়ার দরুণ অপরাধমূলক হিসেবে গণ্য হয় : শুধুমাত্র কোন অপরাধমূলক জ্ঞান বা অভিপ্রায় [with a criminal knowledge or intention] সহকারে সম্পাদিত হওয়ার কারণে অপরাধমূলক বলে গণ্য হয়, এমন কোন কাজ কখনও কতিপয় ব্যক্তির দ্বারা সম্পাদিত হলে অনুরূপ ব্যক্তিগণের প্রত্যেকে, যারা অনুরূপ জ্ঞান বা অভিপ্রায় সহকারে উক্ত কাজে যোগদান করে, উক্ত কাজের জন্য এরূপে দায়ী হবেন যেন উক্ত ব্যক্তি কর্তৃক উক্ত জ্ঞান বা অভিপ্রায় সহকারে একাকী সম্পাদিত হয়েছিল

এই ধারাটি আসলে ৩৪ ধারার সাথে পরিপূরক একটি ধারা। যৌথ দায় এর নীতিটাকেই আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। এই ধারাটি অপরাধমূলক জ্ঞানের ধারা হিসেবে পরিচিত। ইংরেজিতে এটাকে Criminal knowledge বা common criminal knowledge বলা যেতে পারে। মনে রাখবেন।

সাধারণ উপলব্ধির জন্য আমরা একটি সুবিখ্যাত কেস ল’ উদাহরণের আশ্রয় নিতে পারি।

“ক ও খ, গ-কে আঘাত করে। সেই আঘাতে গ মারা যায়। ক ও খ আদালতে অভিযুক্ত হলো। অভিযোগকারী পক্ষ যদি প্রমাণ করিতে পারেন যে, ক এবং খ এর উদ্দেশ্য ছিলো গ-কে মারিয়া ফেলা, তাহা হইলে ক ও খ উভয়ে নরহত্যার দায়ে দায়ী হবেন। এমতাবস্থায় কাহার আঘাতে গ এর মৃত্যু ঘটিয়াছিলো তাহা জানা অনাবশ্যক। কিন্তু এমন হইতে পারে যে, ক, গ-কে মারিতে চাহিয়াছিলেন, এবং খ, গ-কে শুধুমাত্র আঘাত করিতে চাহিয়াছিলেন; সেইক্ষেত্রে খ-কে নরহত্যার দায়ে দায়ী করা চলে না। ক এবং খ এর অভিপ্রায় বা জ্ঞান প্রমাণ করিবার দায়িত্ব অভিযোগকারীর ওপর ন্যস্ত। [AIR 1927 Cal.329]”

কেস ল’ টিতে খেয়াল করুন যে, অপরাধমূলক জ্ঞানের অনুপস্থিতির কারণে খ খুনের দায়ে দায়ী নাও হতে পারে। কেননা, খ জানতো যে, তাকে শুধু আঘাতই করা হবে। গ এর মৃত্যু ঘটানোর সাধারণ অভিপ্রায় ছিলোনা খ এর। প্রমাণ সাপেক্ষে খ শুধুমাত্র আঘাতের দায়ে দায়ী হতে পারে। তার মানে, ৩৫ ধারার উপস্থিতিতে বা প্রয়োগে ভিন্ন ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত হতে পারে বা তার শাস্তি ভিন্ন হতে পারে।

এবার ৩৬ ধারা।

“ধারা ৩৬ : আংশিক কার্যানুষ্ঠান দ্বারা এবং আংশিক কার্য বিরতির দ্বারা সৃষ্ট ফল : যখন কার্যানুষ্ঠান বা কার্য বিরতির দ্বারা কোন বিশেষ ফলাফল ঘটানোর বা উক্ত ফলাফল ঘটানোর কোন উদ্যোগ অপরাধ বলে গণ্য হয়, সেক্ষেত্রে আংশিকভাবে কোন কার্য এবং আংশিকভাবে কোন কার্যানুষ্ঠান বিরতির সাহায্যে উক্ত ফলাফল ঘটানো একই অপরাধ বলে বিবেচনা করতে হবে।

উদাহরণ: ‘ক’ অংশত অবৈধভাবে ‘খ’ কে খাদ্য দান হতে বিরত থেকে এবং অংশত ‘খ’ কে মারধর করে ইচ্ছাপূর্বক ‘খ’ এর মৃত্যু ঘটায়। ‘ক’ খুনের অপরাধে দায়ী হবে।

সহজ বাংলায়, কোনো কাজ আংশিকভাবে করা অথবা আংশিকভাবে না করার মধ্য দিয়ে যদি কোনো অপরাধমূলক ফলাফল / ঘটনা ঘটে তবে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই ধারাটি মূলত কোনো যৌথ দায় নির্ধারণ করে না কিন্তু কোনো ব্যক্তির আংশিক কার্যের ফলাফল কি হবে তা নির্দিষ্ট করা আছে

এইবার ধারা ৩৭। এই ধারাটিও যৌথ দায় সম্পর্কে আলোচনা। খোদ আইনেই তিনটি উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে ধারণাটি। উদাহরণগুলো বোঝার চেষ্টা করুন ভালো করে।

“ধারা : ৩৭ : অপরাধ সংঘটনের কোনো একটি কাজে সহযোগিতা : যখন কতিপয় কাজের দ্বারা অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন যে কেউ উক্ত কাজসমূহের যে কোন একটি সম্পাদনের মাধ্যমে উক্ত অপরাধ সংঘটনকার্যে ইচ্ছাপূর্বক সহযোগিতা করে, সে ব্যক্তি উক্ত অপরাধ সংঘটন করে

ক) ‘ক’ ও ‘খ’ পৃথকভাবে এবং বিভিন্ন সময়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাত্রায় বিষ প্রয়োগ করে ‘গ’ কে খুন করার জন্য একমত হয়। ‘ক’ ও ‘খ’, ‘গ’ কে খুন করার লক্ষ্যে চুক্তি অনুযায়ী বিষ প্রয়োগ করে। ‘গ’ এর প্রতি অনুরূপভাবে প্রযুক্ত কতিপয় মাত্রায় বিষ প্রয়োগের কারণে তার মৃত্যু হয়। এক্ষেত্রে ‘ক’ ও ‘খ’ ইচ্ছাপূর্বকভাবে খুন সংঘটনে সহায়তা করে এবং তাদের প্রত্যেকেই এ ধরণের একটি কাজ সম্পাদন করে যার দ্বারা মৃত্যু সংঘটিত হয়। যদিও তাদের কাজসমূহ স্বতন্ত্র তবুও উভয়েই উক্ত অপরাধের জন্য দোষী।

খ) ‘ক’ ও ‘খ’ যুগ্ম কারাপাল এবং সে অবস্থায় তারা একান্তভাবে এককালীন ছয় ঘণ্টার জন্য বাদী ‘ফ’ এর তত্ত্বাবধানে জন্য নিযুক্ত হয়েছে। ‘ক’ ও ‘খ’, ‘ফ’ এর মৃত্যু ঘটানোর জন্য নিজ নিজ পরিচর্যাকালে ‘ফ’ কে সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে তাদের নিকট সরবরাহকৃত খাদ্য ‘ফ’ কে প্রদান করা হতে অবৈধভাবে বিরত থেকে জ্ঞাতসারে উক্ত ফল সংঘটনে সহযোগিতা করে। ‘ফ’ অনাহারে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ‘ক’ ও ‘খ’ উভয়েই ‘ফ’ কে খুন করার অপরাধে দায়ী।

গ) কারাপাল ‘ক’ এর উপর বন্দী ‘খ’ এর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে। ‘খ’ এর মৃত্যু ঘটানোর লক্ষ্যে ‘ক’, ‘খ’ কে খাদ্য সরবরাহ করা হতে অবৈধভাবে বিরত থাকে; ফলে ‘খ’ খুব বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু শুধু অনাহার তার মৃত্যু ঘটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ‘ক’ নিজ পদ হতে বরখাস্ত হয় এবং ‘গ’ তার স্থলাভিষিক্ত হয়। ‘খ’ কে খাদ্য সরবরাহ না করলে তার মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে এ কথা জেনে ‘গ’, ‘ক’ এর সাথে যোগসাজশ বা সহযোগিতা ছাড়াই ‘খ’ কে খাদ্য সরবরাহ করা হতে অবৈধভাবে বিরত থাকে। ‘খ’ অনাহারে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ‘গ’ খুনের অপরাধে দোষী বলে গণ্য হবে, কিন্তু যেহেতু ‘ক’ এর সাথে সহযোগিতা করেনি, তাই ‘ক’ শুধুমাত্র খুন সংঘটনের উদ্যোগের জন্যই দোষী সাব্যস্ত হবে।

একেবারে পানির মতোই পরিষ্কার হয়ে যাবার কথা। কোনো আলোচনা করলাম না।

এইবার ধারা ৩৮।

“ধারা ৩৮ : অপরাধমূলক কার্যে জড়িত ব্যক্তিগণ বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন : যেক্ষেত্রে কতিপয় ব্যক্তি কোন অপরাধমূলক কার্য সংঘটনে নিয়োজিত কিংবা জড়িত হন, সেক্ষেত্রে তারা উক্ত কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন।

উদাহরণ: ‘ক’ এমন উগ্র প্ররোচনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ‘চ’ কে আক্রমণ করে যে, তার এই আক্রমনে ‘চ’ নিহত হইলে তাহা শুধু অপরাধমূলক প্রাণনাশ হইবে, যাহা খুন বলিয়া গণ্য হইবে না। চ এর প্রতি খ এর বিদ্বেষ থাকায় এবং চ কে হত্যা করিবার জন্য খ এর অভিপ্রায় থাকায়, খ বিনা প্ররোচনায় চ কে হত্যার কার্যে ক কে সহায়তা করে। এই দৃষ্টান্তে ক ও খ উভয়েই চ কে হত্যার কার্যে ব্যাপৃত থাকলেও, খ খুনের অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হবে এবং ক কেবল অপরাধমূলক প্রাণনাশের অপরাধে অপরাধী হবে।

‘অপরাধমূলক প্রাণনাশ হইবে, যাহা খুন বলিয়া গণ্য হইবে না’ – এই কথার বিস্তারিত অর্থ আলোচনা এই টপিকে অসম্ভব। এটা আমরা দণ্ডবিধির ২৯৯ ও ৩০০ ধারা আলোচনার সময় বিস্তারিত বুঝে নেবো। প্রয়োজনে তখন একবার আবারো এই টপিকে এসে ৩৮ ধারাটি দেখে যাবো।

তবে ৩৮ ধারাটি এখুনি আমাদের বুঝে নেয়া দরকার; সেটা অন্য উপায়ে। বাজারের প্রচলিত অনেক বইয়ের লেখক ভুলভাবে এটাকে ৩৪ ধারার ব্যতিক্রম বলে উল্লেখ করেছেন। এটা ঠিক নয়।  বিভিন্ন কেস ল’ এবং এই ধারার ইতিহাস পড়লে দেখা যায় যে, এই ধারাটি মূলত ৩৪ ধারায় বর্ণিত যৌথ দায়ের মৌলিক ধারণাকে আরো একটু প্রশস্ত বা বিস্তৃত করেছে। ৩৮ ধারা ছাড়া আসলে যৌথ দায়ের ধারণাটি সঙ্কুচিত হয়ে পড়তো এবং এমনকি ন্যায় বিচার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করতো। আমরা দু’টো সহজ উদাহরণ দেখি।

দুইজন চোর চুরি করতে গেছে। দুইজন মিলে তারা সিঁদ কাটলো এবং একজন ঐ সিঁদ দিয়ে ঘরে ঢুকলো, অন্যজন বাইরে থেকে গেলো। ঘরে ঢোকার পরপরই চোরটি ধরা পড়লো ঘরে অবস্থানরত মালিকের কাছে। দুইজনের হাতাহাতিতে চোরটি তার কাছে থাকা ছোরা দিয়ে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করলো। এই উদাহরণে অপরাধ রয়েছে দুইটি – চুরি ও খুনচুরি বিষয়ে দুইজনেরই একই অভিপ্রায় ছিলো ও তা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তারা নিয়েছে (ধারা ৩৪)। কিন্তু খুন করা তাদের যৌথ অভিপ্রায় ছিলো না। সুতরাং একজন খুন ও চুরির দায়ে দোষী হবে এবং অন্যজন শুধুমাত্র চুরির দায়ে দোষী হবেন। অর্থাৎ অভিপ্রায় ভিন্ন হলে দায়-দায়িত্বও ভিন্ন হয়। অভিপ্রায়ের ক্ষেত্রে ৩৪ ধারাটি অভিপ্রায়ের ঐক্যের উপস্থিতি থাকলে কি হবে তার নীতি বর্ণনা করেছে; অন্যদিকে ৩৮ ধারাটি অভিপ্রায়ের ভিন্নতার উপস্থিতি বা ঐক্যের অনুপস্থিতি ঘটলে কি হবে, সেই নীতি বর্ণনা করেছে। মোদ্দা কথা : একাধিক ব্যক্তি যদি একটি অপরাধমূলক কাজ করে, কিন্তু তাদের অপরাধমূলক কাজের অভিপ্রায়টি ভিন্ন ভিন্ন হয়, তাহলে তাদের দায়-দায়িত্ব একরকমভাবে বর্তায় না, ফলে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে দণ্ডিত বা অপরাধী সাব্যস্ত হতে পারেন

আমাদের ধারণা, আপনি পরিষ্কার হতে পেরেছেন। তবুও আরেকটা উদাহরণ দিয়ে এই মূল আলোচনা শেষ করবো।

গ এর সাথে ক ও খ এর ঝগড়া হয়। গ এর গালিগালাজে ক ক্ষিপ্ত হয়ে লাঠি দিয়ে গ কে আঘাত করে। খ এরপর একটি কুঠার দিয়ে আঘাত করলে গ একেবারে ধরাশায়ী হয়। খ পরেপরেই তার মাথায় আরো দুটি আঘাত করে কুঠার দিয়ে, যার দরুণ তার মৃত্যু ঘটে। এই উদাহরণটি একটি মামলা থেকে নেয়া। এই মামলায় আদালত খ কে অপরাধমূলক প্রাণনাশের দায়ে এবং ক কে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে।

একনজরে

  • ৩৪ ধারার মূল বিষয় অভিন্ন অভিপ্রায় বা ইচ্ছা নিয়ে কোনো অপরাধ সংঘটন করা।
  • ৩৫ ধারার মূল বিষয় অপরাধমূলক জ্ঞান এবং অপরাধমূলক অভিপ্রায় নিয়ে কোনো অপরাধ সংঘটন করা।
  • ৩৬ ধারার মূল বিষয় কোনো অপরাধমূলক কাজে আংশিক অংশগ্রহণ করা সংক্রান্ত।
  • ৩৭ ধারার মূল বিষয় একটি অপরাধমূলক কাজের বিভিন্ন অংশের কোনো একটি অংশ সম্পাদন করে সহযোগিতা করা সংক্রান্ত।
  • ৩৮ ধারার মূল বিষয় একটি অপরাধমূলক কাজের কোনো একটি অংশের সম্পাদন করা কিন্তু অভিপ্রায় ভিন্ন ভিন্ন থাকা, এবং ফলত ভিন্ন ভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত হওয়া বা সাব্যস্ত হওয়া।


এখানে অনুশীলন করুন।

Penal Code 03

কুইজটি শুরু করতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।